বদলির আদেশ অবজ্ঞা করে প্রকাশ্যে ছিঁড়ে ফেলায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আরও সাত কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া রাষ্ট্রের গোপন দলিল ফাঁস করার অভিযোগে একজন কর্মকর্তা এবং চেয়ারম্যানকে নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগে একজন কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এদিকে সাম্প্রতিক আন্দোলনের কারণে রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করতে ৯ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এনবিআরের বোর্ড প্রশাসন বিভাগের এক চিঠিতে বলা হয়, বদলির আদেশ অবজ্ঞা করে প্রকাশ্যে ছিঁড়ে ফেলার মাধ্যমে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করায় আয়কর ও কাস্টমস বিভাগের সাত কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তারা হলেন– কর অঞ্চল-২ এর কর পরিদর্শক লোকমান হোসেন, ঢাকার আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিটের কর পরিদর্শক নাজমুল হাসান ও আব্দুল্লাহ আল মামুন, কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের (ঢাকা পশ্চিমের) সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ছালেহা খাতুন সাথী, কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের (ঢাকা উত্তর) সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা রৌশনারা আক্তার, কর অঞ্চল-১৪ এর প্রধান সহকারী বিএম সবুজ ও ঢাকা দক্ষিণের কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের সিপাই সালেক খান। বোর্ড প্রশাসন এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য কর ও কাস্টমস প্রশাসনকে চিঠি দিয়েছে। এটি বাস্তবায়ন করে আইআরডিকে জানাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া আন্দোলনের সময় হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজে এনবিআরের চেয়ারম্যানকে নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগে কর অঞ্চল-১০ এর নিরাপত্তা প্রহরী মো. সেলিম মিয়াকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। গতকাল এ বিষয়ে কর অঞ্চল-১০ এর এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সেলিম মিয়ার নামে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে চেয়ারম্যান সম্পর্কে শিষ্টাচারবহির্ভূত মন্তব্য করা হয়। তিনি নিজেও বিষয়টি স্বীকার করেছেন। এ ধরনের আচরণকে অসদাচরণ হিসেবে গণ্য করে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩(খ) বিধি অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে বিধিমালার ১২(১) বিধি অনুযায়ী তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী বরখাস্তকালীন তিনি খোরপোশ ভাতা পাবেন।
এদিকে রাষ্ট্রের গোপন দলিল প্রকাশ করার অভিযোগে এনবিআরের দ্বিতীয় সচিব ও উপ কর কমিশনার মুকিতুল হাসানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। গতকাল আইআরডির এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, মুকিতুল হাসান রাষ্ট্রের অত্যন্ত গোপন দলিল প্রকাশ করে চাকরির শৃঙ্খলা পরিপন্থি আচরণ করায় তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত করে বিভাগীয় কার্যধারা গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তাঁকে সরকারি চাকরি আইন ২০১৮-এর ৩৯(১) ধারা অনুযায়ী এনবিআরের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ করে সরকারি চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বিধি অনুযায়ী বরখাস্তকালীন তিনি খোরপোশ ভাতা পাবেন।
গতকাল রাতে আইআরডির পৃথক আরেকটি আদেশে এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের (সিআইসি) উপপরিচালক (উপ কর কমিশনার) মো. জিল্লুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধেও বদলির আদেশ প্রকাশ্যে ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগ আনা হয়। তিনিও নিয়ম অনুযায়ী বরখাস্তকালীন খোরপোশ ভাতা পাবেন।
এদিকে, বদলির আদেশ প্রকাশ্যে ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগে গত মঙ্গলবার মোট ১৪ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। যাদের মধ্যে এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের সভাপতি অতিরিক্ত কমিশনার হাছান মুহম্মদ তারেক রিকাবদার ও সহসভাপতি মীর্জা আশিক রানা রয়েছেন। এর আগে ২ জুলাই এনবিআরের কর বিভাগ ও কাস্টমস বিভাগের তিন সদস্য ও এক কর কমিশনারকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। ১ জুলাই রাতে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনার মো. জাকির হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, আন্দোলন সম্পর্কিত ঘটনায় এখন পর্যন্ত মোট ২৯ কর্মকর্তা-কর্মচারী সাময়িক বরখাস্ত ও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। এদের প্রায় সবাই এনবিআর সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে।
ক্ষতি নিরূপণে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি
এদিকে কর, শুল্ক ও ভ্যাট বিভাগের সাম্প্রতিক কর্মবিরতি ও শাটডাউন কর্মসূচির কারণে দেশের অর্থনীতিতে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করেছে সরকার।
গতকাল এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের শুল্ক-২ শাখা থেকে একটি অফিস আদেশ জারি করা হয়। ৯ সদস্যবিশিষ্ট কমিটির আহ্বায়ক আইআরডির যুগ্ম সচিব সৈয়দ রবিউল ইসলাম ও সদস্য সচিব আইআরডির প্রশাসন-১ শাখার উপসচিব হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। তবে কোনো নাম প্রস্তাব না করে পদ ও বিভাগের নাম উল্লেখ করা হয়েছে আদেশে। কমিটিতে সদস্য হিসেবে থাকবেন অর্থ বিভাগ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, এনবিআর, বিজিএমইএ এবং এফবিসিসিআইয়ের প্রতিনিধিরা।
কমিটি গত ২৮ ও ২৯ জুন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস বন্ধ থাকার কারণে কতটুকু রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে, তা নির্ধারণ করবে।
সম্পাদক - হুসনে মোবারক
প্রকাশক - মো: ইশতিয়াক আহমেদ